চাঁদের পাহাড় অধ্যায় ৭-৯: সারাংশ, শব্দার্থ, টীকা ও Important প্রশ্নোত্তর | ICSE Class 9 Bengali
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চাঁদের পাহাড়’ উপন্যাসের সপ্তম থেকে নবম পরিচ্ছেদে (চাঁদের পাহাড় অধ্যায় ৭-৯) শঙ্কর ও আলভারেজের আফ্রিকা অভিযানের কাহিনি আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। গভীর অরণ্য, দুর্গম পর্বত, রহস্যময় বুনিপ, ভয়ংকর আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত এবং শেষ পর্যন্ত আলভারেজের মৃত্যু—এই তিনটি পরিচ্ছেদে একের পর এক নাটকীয় ঘটনা ঘটতে থাকে।
এই অংশে শুধু অভিযানের রোমাঞ্চই নেই; শঙ্করের সাহস, আত্মসম্মান, দায়িত্ববোধ এবং অজানা বিপদের মুখে তার মানসিক দৃঢ়তাও বিশেষভাবে প্রকাশ পেয়েছে। তাই ICSE Class 9 Bengali পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য এই অংশের কাহিনিসংক্ষেপ, শব্দার্থ, টীকা এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর ভালোভাবে জানা প্রয়োজন।
চাঁদের পাহাড় ৭ম পরিচ্ছেদ: গভীর অরণ্যে বুনিপের আতঙ্ক
সপ্তম পরিচ্ছেদে শঙ্কর ও আলভারেজ রিখটারসভেল্ডের প্রকৃত পর্বতশ্রেণির দিকে আরও গভীরে প্রবেশ করে। পশ্চিম দিকে প্রায় পাঁচ দিন চলার পর তারা পর্বতে উঠতে শুরু করে। চারপাশের পরিবেশ ক্রমশ দুর্গম হয়ে ওঠে। গাছের গুঁড়িগুলি যেন ধাপে ধাপে আকাশের দিকে উঠে গেছে। পথে তারা কালোবাস জাতীয় মাদি বানর দেখতে পায়। এলিফ্যান্ট ঘাসের বনও তাদের অতিক্রম করতে হয়।
অভিযানের এই পর্যায়ে আলভারেজ ম্যাপ দেখে কিছুটা সংশয়ে পড়ে যায়। তাদের চলার পথ ঠিক আছে কি না, তা নিয়ে তার মনে সন্দেহ দেখা দেয়। এর মধ্যেই এক রাতে তাঁবুর আশপাশ দিয়ে একটি অদ্ভুত প্রাণী চলে যায়। তার ভারী অথচ লঘুপদ চলাফেরা এবং অস্বাভাবিক শব্দ শঙ্কর ও আলভারেজকে আতঙ্কিত করে। তারা বুঝতে পারে, এটাই স্থানীয়দের কথিত বুনিপ।
পরদিন প্রবল বৃষ্টি শুরু হয়। বৃষ্টি দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে। একসময় সেই রহস্যময় প্রাণী গাছপালা ভেঙে দ্রুত পালিয়ে যায়। আলভারেজ বুঝতে পারে, তারা সম্ভবত একই জায়গার চারপাশে ঘুরছে।
গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ
- চড়াই — পর্বতে ওঠা
- উৎরাই — পর্বত থেকে নামা
- দুষ্প্রাপ্য — যা সহজে পাওয়া যায় না
- স্ফটিক — স্বচ্ছ ও সাদা পাথরবিশেষ
- তৃষ্ণার্ত — পিপাসার্ত
- সম্বরণ/সংবরণ — দমন, নিয়ন্ত্রণ
- অনিবার্য — যা নিশ্চিতভাবে ঘটবে
- বৃংহতিধ্বনি — হাতির ডাক
- ধাঁধা — সংশয়, চোখের ভুল
- কাকলি — পাখির মধুর ডাক
- কৌমুদী শুভ্র — জ্যোৎস্নার মতো সাদা
- বনস্পতি — বড়ো বড়ো গাছ
- গুঁড়ি — গাছের কাণ্ড
- অনুসন্ধান — খোঁজখবর
- কুলপি বরফ — কোণাকৃতি টিনের ছাঁচে জমানো বরফের খাবার
- কম্পাস — দিক নির্ণয়ের যন্ত্র
টীকা: কুয়াশা
কোনো স্থানের তাপমাত্রা হঠাৎ কমে গেলে বাতাসের জলীয়বাষ্প ক্ষুদ্র জলবিন্দুতে পরিণত হয়ে ধোঁয়ার মতো চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। একে কুয়াশা বলে। ঘন কুয়াশায় কাছাকাছি গাছপালা বা মানুষকেও স্পষ্ট দেখা যায় না। ফলে পথ চলা কঠিন হয়ে পড়ে এবং দুর্ঘটনার সম্ভাবনাও বাড়ে।
টীকা: উপত্যকা
পাহাড় বা পর্বতের মধ্যবর্তী অপেক্ষাকৃত নিচু অঞ্চলকে উপত্যকা বলা হয়। সাধারণত এই নিম্নভূমির মধ্য দিয়ে নদী বা জলধারা প্রবাহিত হতে পারে।
চাঁদের পাহাড় ৭ম পরিচ্ছেদ: গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১. “জানোয়ারটা যাই হোক না কেন, তার বুদ্ধি আছে, বিচারের ক্ষমতা আছে, মস্তিষ্ক আছে।”
(ক) ‘জানোয়ারটা’ কী?
(খ) এই জানোয়ার সম্পর্কে কাফির সর্দারের কী অভিমত?
(গ) তার কী চিহ্ন বা লক্ষণ পাওয়া যায়?
(ঘ) কোন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তার বুদ্ধি, বিচারের ক্ষমতা ও মস্তিষ্কের কথা বলা হয়েছে?
(ঙ) এই জানোয়ার কীভাবে একজন মানুষকে হত্যা করে?
উত্তর: (ক) বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের চাঁদের পাহাড় উপন্যাসের সপ্তম পরিচ্ছেদের আলোচ্য অংশে যে অদ্ভুত জানোয়ারটির কথা বলা হয়েছে, তার নাম বুনিপ।
(খ) কাফির সর্দার আলভারেজ ও জিম কার্টারকে রিখটারসভেল্ড পর্বত সম্পর্কে নানা কথা বলেছিল। তার মতে, ওই অঞ্চলে সাদা পাথর অর্থাৎ হিরে রয়েছে এবং সেখানে ‘বুনিপ’ নামে এক উপদেবতা বাস করে। তার গ্রামের তিনজন সাহসী মানুষ নিষেধ অমান্য করে ওই পাহাড়ে গিয়েছিল, কিন্তু আর ফিরে আসেনি। একজন সাদা মানুষও সেখানে গিয়েছিল এবং সেও আর ফিরে আসেনি।
(গ) এক রাতে তাঁবুর বাইরে অদ্ভুত শব্দ শোনা যায়। শব্দটি মানুষের গলার মতো ছিল না। মনে হচ্ছিল, ভারী অথচ লঘুপদ কোনো প্রাণী অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে চলে যাচ্ছে। তার পায়ের দৈর্ঘ্য প্রায় এগারো ইঞ্চি এবং পায়ে মাত্র তিনটি আঙুল ছিল। নখগুলি ছিল তরবারির ডগার মতো ধারালো।
(ঘ) এক রাতে আলভারেজ ও শঙ্কর তাঁবুর চারপাশে অদ্ভুত কোনো প্রাণীর চলাফেরা টের পায়। প্রাণীটি তাঁবুর চারদিকে ঘুরছিল এবং তার জোরে নিশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। হঠাৎ গাছপালা ভেঙে সেটি ছুটে পালায়। শঙ্কর ও আলভারেজ তখন বুঝতে পারে, তাদের উপস্থিতি এবং সতর্কতা প্রাণীটি বুঝতে পেরেছে। অতর্কিতে আক্রমণ করা সম্ভব হবে না বুঝেই সেটি সরে যায়। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই প্রাণীটির বুদ্ধি ও বিচারক্ষমতার কথা বলা হয়েছে।
(ঙ) বুনিপ আলভারেজের প্রথম অভিযানের সঙ্গী ইংরেজ অভিযাত্রী জিম কার্টারকে হত্যা করে। একদিন জঙ্গলে বিশ্রাম নেওয়ার সময় তারা একটি ঘন ঝোপের মধ্যে অস্বাভাবিক নড়াচড়া দেখতে পায়। জিম কার্টার সেখানে প্রবেশ করতেই তার আর্তচিৎকার শোনা যায়। আলভারেজ ছুটে গিয়ে দেখে, জিম রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। ধারালো নখের আঘাতে তার মুখ থেকে বুক পর্যন্ত ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল। সেখানেই তার মৃত্যু হয়।
প্রশ্ন ২. “এই মহাদুর্গম পর্বত ও অরণ্যে সে ভারতের প্রতিনিধি—এমন কোনো কাজ সে করতে পারে না যাতে তার মাতৃভূমির মুখ ছোট হয়ে যায়।”
(ক) এখানে ভারতের প্রতিনিধি কে?
(খ) অরণ্য মহাদুর্গম কেন?
(গ) পর্বত মহাদুর্গম কেন?
(ঘ) মাতৃভূমির মুখ ছোট হয়ে যায় কোন কাজ করলে?
(ঙ) ভারতের প্রতিনিধির পরিচয় দাও।
উত্তর: (ক) এখানে ভারতের প্রতিনিধি হল শঙ্কর, উপন্যাসের প্রধান চরিত্র।
(খ) অরণ্যটি নদী ও বিভিন্ন বন্যপ্রাণীতে ঘেরা। ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সঠিক পথ খুঁজে নেওয়া কঠিন। এই কারণেই অরণ্যটি মহাদুর্গম।
(গ) পর্বতটি অত্যন্ত দুর্গম ও দূরারোহ। এর শৃঙ্গগুলি খাড়া এবং কোথাও সহজে ওঠার মতো ঢাল নেই। প্রায় দেড়শো মাইল বিস্তৃত পর্বতাঞ্চলের মধ্যে কোথায় ওঠার উপযুক্ত জায়গা রয়েছে, তা খুঁজে পাওয়াই কঠিন। তার ওপর পর্বতটি ভয়ংকর অরণ্যে পূর্ণ।
(ঘ) শঙ্কর নিজের ক্লান্তি ও অবসন্নতার কথা আলভারেজের কাছে প্রকাশ করতে চায় না। তার মনে হয়, এতে আলভারেজের কাছে ভারতীয়দের দুর্বল বা অপদার্থ বলে মনে হতে পারে। নিজের আচরণের মাধ্যমে মাতৃভূমির সম্মান ক্ষুণ্ণ করতে চায় না শঙ্কর।
(ঙ) শঙ্কর শুধু একজন ভবঘুরে পথিক নয়; সে একজন সাহসী ও অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় অভিযাত্রী। অজানাকে জানার প্রবল আকাঙ্ক্ষা তার মধ্যে রয়েছে। মাতৃভূমির প্রতি তার গভীর শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধ রয়েছে। পাশাপাশি সে প্রকৃতির সৌন্দর্যের প্রতিও সংবেদনশীল।

চাঁদের পাহাড় ৮ম পরিচ্ছেদ: আগ্নেয়গিরির অগ্নিলীলা
অষ্টম পরিচ্ছেদে শঙ্কর ও আলভারেজ এমন এক ভয়ংকর প্রাকৃতিক দৃশ্যের মুখোমুখি হয়, যা তাদের অভিযানের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা হয়ে ওঠে।
মাঝরাতে অজানা শব্দে শঙ্করের ঘুম ভেঙে যায়। বাইরে এসে তারা দেখতে পায়, বন্যপ্রাণীরা যেন কোনো অজানা বিপদের আশঙ্কায় পশ্চিমের অরণ্য ছেড়ে পূর্বদিকে পালিয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ এবং তীব্র আলোর বিচ্ছুরণে চারপাশ কেঁপে ওঠে।
একটি সুপ্ত আগ্নেয়গিরি জেগে উঠেছে।
তাদের তাঁবুর কাছেই একটি বিরাট জ্বলন্ত পাথর এসে পড়ে এবং আশপাশের গাছপালায় আগুন ধরে যায়। আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত চলতে থাকে দুদিন দু-রাত ধরে। আকাশ আগুন-রাঙা মেঘে ঢেকে যায়। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে গন্ধকের তীব্র গন্ধ। গাছের পাতার ওপর জমতে থাকে ধূসর মিহি ছাই।
শেষদিকে বিস্ফোরণের ফলে আগ্নেয়গিরির মুখের একটি অংশ উড়ে যায়। ম্যাপ দেখে আলভারেজ জানতে পারে, পর্বতটির নাম ওলডোনিও লেঙ্গাই, যার অর্থ ‘অগ্নিদেবের শয্যা’।
এই ভয়ংকর অথচ অপূর্ব প্রাকৃতিক দৃশ্য শঙ্করের মনে গভীর বিস্ময় সৃষ্টি করে। সে এর মধ্যে রুদ্রদেবের ধ্বংসরূপ দেখতে পায় এবং শ্রদ্ধায় তাঁকে প্রণাম করে।
গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ
- বিজলি — বৈদ্যুতিক
- গন্ধক — হলুদ রঙের মৌলিক পদার্থ, সালফার
- তুবড়ি — একধরনের আতসবাজি
- গটিসটি — জড়োসড়ো
- ব্যস্তসমস্ত — অত্যন্ত ব্যস্ত
- একপুরু — একপ্রস্থ বা একস্তর
- চড়া — শৃঙ্গ
- মুণ্ড — মাথা
- দীপ্ত — উজ্জ্বল
- ললাট — কপাল
- দাবানল — বনের বিধ্বংসী আগুন
চাঁদের পাহাড় ৮ম পরিচ্ছেদ: গুরুত্বপূর্ণ টীকা
১. ওলডোনিও লেঙ্গাই
হিরের খনির সন্ধানে শঙ্কর ও আলভারেজ আফ্রিকার গভীর অরণ্যে যে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত প্রত্যক্ষ করেছিল, ম্যাপে সেই পর্বতটির নাম ছিল ওলডোনিও লেঙ্গাই। নামটির অর্থ ‘অগ্নিদেবের শয্যা’। দীর্ঘদিন সুপ্ত থাকা আগ্নেয়গিরিটির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে তার প্রকৃত ধ্বংসাত্মক রূপ প্রকাশ পায়।
২. কালোবাস বাঁদর
আফ্রিকার অরণ্যে দেখা যায় এমন একধরনের বাঁদর হল কালোবাস বাঁদর। এদের স্ত্রীজাতির গোঁফ-দাড়ি থাকে, কিন্তু পুরুষদের থাকে না। তারা ছানাপোনা নিয়ে দলবদ্ধভাবে থাকে। আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের সময় অন্যান্য বন্যপ্রাণীর সঙ্গে কালোবাস বাঁদরদেরও প্রাণভয়ে পালাতে দেখা যায়।
৩. অগ্নিকটাহ
অগ্নিকটাহ বলতে আগুনের কড়াই বা আগুনে ভরা কড়াইয়ের মতো দৃশ্যকে বোঝানো হয়েছে। জেগে ওঠা আগ্নেয়গিরির মুখ থেকে যখন লাভা ও আগুন বেরিয়ে আসে, তখন তার চেহারা অনেকটা আগুনভরা কড়াইয়ের মতো দেখায়।
৪. রুদ্রদেব
হিন্দু ধর্মীয় ভাবনায় মহাদেব শিবের একটি রূপ হল রুদ্র। শিব যেমন মঙ্গল ও সুন্দর রূপের প্রতীক, তেমন রুদ্ররূপে তিনি ধ্বংসের প্রকাশ ঘটান। আগ্নেয়গিরির ভয়ংকর অগ্নিলীলার মধ্যে শঙ্কর রুদ্রদেবের ধ্বংসরূপ উপলব্ধি করেছিল।
৮ম পরিচ্ছেদ: প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ৩. “কুলপি বরফটাতে ঠিক যেন কে আর একটা কামড় বসিয়েছে।”
(ক) ‘কুলপি বরফ’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
(খ) সেটি কীভাবে কুলপি বরফের আকার লাভ করেছে?
(গ) পূর্ববর্তী দৃশ্য বর্ণনা করো।
(ঘ) পরবর্তী ঘটনা সংক্ষেপে লেখো।
উত্তর: (ক) ‘চাঁদের পাহাড়’ উপন্যাসের অষ্টম পরিচ্ছেদে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের পর পাহাড়ের চূড়ার যে অদ্ভুত আকৃতি হয়েছিল, তাকে কুলপি বরফের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
(খ) ওলডোনিও লেঙ্গাইয়ের অগ্ন্যুৎপাতের ফলে পাহাড়ের চূড়ার একটি অংশ বিস্ফোরণে উড়ে যায়। নীচের উপত্যকা ছাই, আগুন ও জ্বলন্ত পাথরে ঢেকে যায়। পরদিন দিনের আলোয় দেখা যায়, মোমবাতির শিখায় মাথার অংশ যেমন অসমানভাবে ক্ষয়ে যায়, পাহাড়ের চূড়াটিও তেমন খাঁজযুক্ত হয়েছে। তাই শঙ্করের মনে হয়েছিল, যেন কুলপি বরফে আর-একটি কামড় বসানো হয়েছে।
(গ) এর আগে আগ্নেয়গিরির এক ভয়ংকর অথচ অপূর্ব দৃশ্য দেখা যায়। অগ্ন্যুৎপাতের আলোয় চারপাশের দিগন্ত আলোকিত হয়ে ওঠে। আগুন-রাঙা মেঘ পাহাড়ের চূড়ার অনেক ওপরে উঠে যায় এবং বাতাসে গন্ধকের তীব্র গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। মনে হয়, যেন অসংখ্য তুবড়ি একসঙ্গে জ্বলছে অথবা বহু রংমশালে একসঙ্গে আগুন দেওয়া হয়েছে। মাঝে মাঝে আগুনের মেঘ হঠাৎ দপ করে আরও ওপরে উঠে যায় এবং চারদিকে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।
(ঘ) আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের সময় প্রায় পনেরো সের ওজনের একটি জ্বলন্ত পাথর শঙ্কর ও আলভারেজের তাঁবুর কাছের ঝোপের ওপর এসে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে ঝোপে আগুন ধরে যায়। আরও জ্বলন্ত পাথর চারপাশে পড়তে থাকে। গন্ধকের ধোঁয়ায় শ্বাস নেওয়া কঠিন হয়ে ওঠে। বিপদ বুঝতে পেরে শঙ্কর ও আলভারেজ তাঁবু গুটিয়ে নিরাপদ জায়গার দিকে পালাতে থাকে।
প্রশ্ন ৪. “পালাও, পালাও; শঙ্কর—তাঁবু ওঠাও—শিগগির!”
(ক) কে এই কথা বলেছে?
(খ) কোন প্রসঙ্গে বলেছে?
(গ) কারা কীভাবে পালিয়ে বাঁচে?
(ঘ) এরপরের ঘটনা বর্ণনা করো।
উত্তর: (ক) কথাটি ডিয়েগো আলভারেজ বলেছে।
(খ) আগ্নেয়গিরি থেকে একটি বড়ো জ্বলন্ত পাথর শঙ্করদের তাঁবুর কাছের ঝোপের ওপর এসে পড়ে এবং সঙ্গে সঙ্গে সেখানে আগুন ধরে যায়। আরও জ্বলন্ত পাথর এসে পড়তে পারে এবং তাঁবুতেও আগুন লাগতে পারে—এই আশঙ্কায় আলভারেজ দ্রুত তাঁবু গুটিয়ে পালানোর কথা বলে।
(গ) শঙ্কর ও আলভারেজ তাড়াতাড়ি তাঁবু গুটিয়ে নেয়। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিছুটা টেনে-হিঁচড়ে এবং কিছুটা বয়ে নিয়ে তারা প্রায় দু-ঘণ্টা দৌড়ে পূর্বদিকের পাহাড়ের নীচে পৌঁছায়। কিন্তু সেখানেও আগ্নেয়গিরির প্রভাব পৌঁছে যায়। পরে জ্বলন্ত পাথর পড়তে শুরু করলে তারা পাহাড়ের ওপর উঠতে থাকে। সারারাতের কঠোর পরিশ্রমের পর তারা প্রায় দুই-আড়াই হাজার ফুট উঁচুতে একটি তুলনামূলক নিরাপদ জায়গায় পৌঁছায়।
(ঘ) দুদিন ধরে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত চলতে থাকে। বিস্ফোরণের ফলে পাহাড়ের চূড়ার অংশ উড়ে যায় এবং নীচের জঙ্গল ও উপত্যকা ছাই, আগুন ও জ্বলন্ত পাথরে ঢেকে যায়। জ্বলন্ত পাথরের আঘাতে গাছের ডাল ভেঙে পড়ে। পাথরের ঘায়ে আলভারেজও আহত হয়। এমনকি তাদের তাঁবুতেও আগুন ধরে যায়।

চাঁদের পাহাড় ৯ম পরিচ্ছেদ: আলভারেজের মৃত্যু
নবম পরিচ্ছেদে শঙ্কর ও আলভারেজ গ্রানাইটের পাহাড়ের ওপর তাঁবু ফেলে। আলভারেজ বুঝতে পারে, তারা প্রায় পনেরো দিন ধরে একই ধরনের পথে ঘুরে চলেছে। সঠিক অবস্থান নির্ণয়ের জন্য সে নক্ষত্র দেখে দিক ও অবস্থান বোঝার চেষ্টা করে।
কিন্তু এই সময়ই ঘটে ভয়ংকর বিপর্যয়। বুনিপের আক্রমণে আলভারেজের মৃত্যু হয়, অনেকটা জিম কার্টারের মৃত্যুর মতো। সেই রাতে প্রবল বর্ষণ শুরু হয়। অরণ্যের অন্ধকার, ঝড়-বৃষ্টি এবং আলভারেজের মৃত্যুর কারণে শঙ্কর গভীর আতঙ্ক ও একাকিত্বের মধ্যে পড়ে যায়।
পরদিন সকালে শঙ্কর আলভারেজের মৃতদেহ সমাধিস্থ করে। দীর্ঘদিনের অভিযাত্রী আলভারেজের রত্নখনির সন্ধান এখানেই শেষ হয়। কিন্তু শঙ্করের অভিযান থেমে যায় না।
এই অংশটি শঙ্করের চরিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও প্রকাশ করে—সহযাত্রীর মৃত্যুতে ভেঙে পড়লেও সে নিজের দায়িত্ব ও অভিযানের সংকল্প থেকে সরে যায় না।
গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ
- আঁচটিও — আগুনের ঝাঁঝ বা আভাটিও
- প্রত্যুত্তর — পালটা উত্তর
- তীক্ষ্ণ — ধারালো
- ফালা ফালা — ছিঁড়ে টুকরো টুকরো
- সংজ্ঞা — জ্ঞান
- ঐশ্বর্য — ধনসম্পদ
- স্তব্ধ — স্থির, নিস্তব্ধ
- সমগ্র — সমস্ত
- নির্ভিকতা — ভয়হীনতা, সাহসিকতা
- সংকল্পে অটলতা — প্রতিজ্ঞা থেকে সরে না যাওয়া
- সন্ধান — খোঁজখবর
- নৈশ — রাত্রিকালীন
- ম্যাগাজিন — বন্দুকের যে অংশে গুলি ভরা থাকে
- মারণাস্ত্র — যে অস্ত্র দিয়ে মৃত্যু বা ধ্বংস ঘটানো যায়
- ভাগ্যান্বেষী — যে সৌভাগ্যের সন্ধান করে
- লোকালয় — যেখানে মানুষ বসবাস করে
- কাঙাল — ভিখারি
চাঁদের পাহাড় ৯ম পরিচ্ছেদ: গুরুত্বপূর্ণ টীকা
চুনাপাথর
চুন তৈরিতে ব্যবহৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ পাথর হল চুনাপাথর বা Limestone। সিমেন্ট ও কাচ শিল্পেও এর ব্যবহার রয়েছে।
গ্রানাইট
গ্রানাইট একধরনের আগ্নেয় শিলা বা igneous rock। মূর্তি ও বিভিন্ন নির্মাণকাজে এই শিলা ব্যবহৃত হয়।
বঙ্কিমচন্দ্র
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যে ‘সাহিত্য সম্রাট’ নামে পরিচিত। তিনি বহু গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস ও প্রবন্ধ রচনা করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে রাজসিংহ, কপালকুণ্ডলা, সীতারাম, কৃষ্ণকান্তের উইল ও বিষবৃক্ষ। চাঁদের পাহাড় উপন্যাসেও তাঁর রাজসিংহ উপন্যাসের উল্লেখ পাওয়া যায়।
উইনচেস্টার
উইনচেস্টার একটি বিশেষ ধরনের রাইফেল। এটি আমেরিকায় তৈরি হয়েছিল এবং বিভিন্ন যুদ্ধে এই ধরনের রাইফেল ব্যবহৃত হয়েছে।
ম্যানলিকার
ম্যানলিকার একধরনের রাইফেল। অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সেনাবাহিনীতে এর ব্যবহার ছিল এবং যুদ্ধক্ষেত্রেও এটি ব্যবহৃত হয়েছে।
চাঁদের পাহাড় ৯ম পরিচ্ছেদ: প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ৫. “এই দুই শক্তিশালী অতি ভয়ানক মারণাস্ত্রকে উপেক্ষা করে আজ রাত্রে অক্ষতদেহে তাঁবুতে ঢুকতে পারে।”
(ক) কথাটি কে বলেছে?
(খ) এখানে কোন রাতের কথা বলা হয়েছে?
(গ) কোন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এমন কথা বলা হয়েছে?
(ঘ) উল্লিখিত দুটি মারণাস্ত্রের নাম লেখো।
উত্তর: (ক) বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের চাঁদের পাহাড় উপন্যাসের নবম পরিচ্ছেদের এই কথাটি শঙ্করের মনে এসেছিল।
(খ) এখানে শঙ্করের জীবনের একটি ভয়ংকর রাতের কথা বলা হয়েছে। সেই রাতে বুনিপের আক্রমণে আলভারেজের মৃত্যু হয়েছে। বাইরে প্রচণ্ড বৃষ্টি ও ঝড় চলছিল। গাছের ডালপালা ভেঙে পড়ছিল এবং অন্ধকার অরণ্যের পরিবেশ আরও ভয়ংকর হয়ে উঠেছিল। বন্ধুর মৃতদেহ সামনে নিয়ে শঙ্কর একা তাঁবুর মধ্যে বসেছিল।
(গ) আলভারেজের মৃত্যুর পর শঙ্কর একা হয়ে পড়ে। তার মনে আশঙ্কা হয়, যে বুনিপ আলভারেজকে হত্যা করেছে, সেটি হয়তো তাকে আক্রমণ করতেও পারে। সেই সময় তার চোখ পড়ে সামনে রাখা দুটি রাইফেলের দিকে। দুটির ম্যাগাজিনই গুলিতে ভরা ছিল। তাই শঙ্করের মনে হয়, এত শক্তিশালী অস্ত্রকে উপেক্ষা করে কোনো প্রাণীর পক্ষে তাঁবুর মধ্যে ঢুকে তাকে আক্রমণ করা সহজ হবে না। এই ভাবনার পরিপ্রেক্ষিতেই উক্তিটি এসেছে।
(ঘ) দুটি মারণাস্ত্র হল—
১. উইনচেস্টার রাইফেল
২. ম্যানলিকার রাইফেল
পরীক্ষার জন্য ৭-৯ পরিচ্ছেদের মূল বিষয় এক নজরে
এই তিনটি পরিচ্ছেদ মনে রাখার সবচেয়ে সহজ উপায় হল ঘটনাগুলিকে একটি ধারায় সাজানো—
রিখটারসভেল্ডের গভীর অরণ্য
↓
বুনিপের উপস্থিতির প্রমাণ
↓
শঙ্কর-আলভারেজের বিপদের আশঙ্কা
↓
ওলডোনিও লেঙ্গাইয়ের অগ্ন্যুৎপাত
↓
তাঁবু ছেড়ে নিরাপদ জায়গায় পালানো
↓
আলভারেজের বুনিপের হাতে মৃত্যু
↓
শঙ্করের একাকিত্ব
↓
আলভারেজের সমাধি
এই ধারাটি মাথায় রাখলে সপ্তম, অষ্টম ও নবম পরিচ্ছেদের ঘটনাগুলি আলাদা আলাদা করে মুখস্থ করার প্রয়োজন অনেকটাই কমে যাবে।
নিজের ভাষায় উত্তর লেখার টিপস
চাঁদের পাহাড় থেকে পরীক্ষায় উদ্ধৃতিভিত্তিক প্রশ্ন এলে শুধু ঘটনার নাম লিখলে পূর্ণ নম্বর পাওয়া কঠিন হতে পারে। উত্তরের মধ্যে তিনটি বিষয় রাখার চেষ্টা করবে—
- উদ্ধৃতিটি কোন পরিচ্ছেদ ও কোন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত, তা শুরুতেই উল্লেখ করা।
- প্রশ্নে যে বিষয়টি জানতে চাওয়া হয়েছে, সেটির কারণ বা ঘটনাপ্রবাহ পরিষ্কার করে লেখা।
- শেষে মূল বক্তব্য বা চরিত্রের মানসিক অবস্থাটি নিজের ভাষায় তুলে ধরা।
বিশেষ করে সপ্তম থেকে নবম পরিচ্ছেদে বুনিপ, ওলডোনিও লেঙ্গাই, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, শঙ্করের সাহস এবং আলভারেজের মৃত্যু—এই বিষয়গুলি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। তাই আলাদা আলাদা তথ্য মুখস্থ করার বদলে ঘটনাগুলির সম্পর্ক বুঝে পড়লে উত্তর লেখা অনেক সহজ হবে।
উপসংহার
চাঁদের পাহাড় উপন্যাসের ৭ম-৯ম পরিচ্ছেদে অভিযানের রোমাঞ্চ ধীরে ধীরে ভয়ংকর বাস্তবতার দিকে এগিয়ে যায়। বুনিপের রহস্য, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত এবং আলভারেজের মৃত্যু শঙ্করের অভিযানের পথকে আরও কঠিন করে তোলে। একইসঙ্গে এই ঘটনাগুলির মধ্য দিয়ে শঙ্করের সাহস, আত্মমর্যাদা, প্রকৃতির প্রতি বিস্ময় এবং সংকল্পের পরিচয়ও স্পষ্ট হয়।
তাই ICSE Class 9 Bengali পরীক্ষার জন্য এই তিনটি পরিচ্ছেদ পড়ার সময় শুধু কাহিনি মনে রাখলেই হবে না; কোন ঘটনা কোন উদ্ধৃতি বা প্রশ্নের সঙ্গে সম্পর্কিত, সেটিও বুঝে রাখা জরুরি।

2 Comments