চাঁদের পাহাড় অধ্যায় ১০-১২: সারাংশ, শব্দার্থ ও ৫টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চাঁদের পাহাড়’ উপন্যাসের দশম থেকে দ্বাদশ পরিচ্ছেদে শঙ্করের অভিযাত্রা আরও কঠিন ও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। আলভারেজের মৃত্যুর পর একেবারে একা অবস্থায় শঙ্করকে অজানা আফ্রিকার অরণ্য পেরিয়ে সলসবেরির দিকে এগিয়ে যেতে হয়। কিন্তু তার কাছে থাকা মানচিত্রগুলি এই বিশাল অরণ্যের প্রকৃত পথ বুঝতে যথেষ্ট সাহায্য করে না। ফলে শুরু হয় তার এক ভয়ংকর দিশাহারা যাত্রা।
প্রথমে ঘন জঙ্গলে রাত কাটানো, তারপর গুহার ভিতরে পথ হারিয়ে কয়েক দিন আটকে থাকা, সেখান থেকে কোনওরকমে বেরিয়ে কালাহারি মরুভূমিতে প্রবেশ—প্রতিটি পর্যায়েই শঙ্করকে মৃত্যুর খুব কাছাকাছি যেতে হয়। শেষ পর্যন্ত একটি গুহায় আত্তিলিও গাত্তির নরকঙ্কাল ও তার রেখে যাওয়া চিঠি আবিষ্কার করে সে এমন এক রহস্যের সন্ধান পায়, যার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু বছর আগের এক অসমাপ্ত হিরের অভিযানের ইতিহাস।
তাই চাঁদের পাহাড় অধ্যায় ১০-১২ শুধু শঙ্করের বিপদসংকুল যাত্রার অংশ নয়; এই অধ্যায়গুলিতে তার সাহস, ধৈর্য, বুদ্ধি এবং অজানাকে জানার আগ্রহও বিশেষভাবে ফুটে ওঠে।
অধ্যায় ১০: অরণ্যের মধ্যে শঙ্করের দিগ্ভ্রান্ত যাত্রা
আলভারেজের মৃত্যুর পর শঙ্করের সামনে সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়—কীভাবে সে অরণ্য পেরিয়ে সলসবেরিতে পৌঁছাবে। তার কাছে কয়েকটি মানচিত্র ছিল। কিন্তু সেই মানচিত্রে অরণ্য, পাহাড়-পর্বত ও পথ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য খুব স্পষ্টভাবে দেওয়া ছিল না। আলভারেজ ও জিম কার্টারের ম্যাপে কিছু সাংকেতিক চিহ্নও ছিল, যেগুলির অর্থ শঙ্করের কাছে সহজে বোধগম্য হচ্ছিল না।
শেষ পর্যন্ত নিজের আন্দাজের উপর নির্ভর করেই শঙ্কর পূর্বদিকে এগিয়ে যেতে শুরু করে।
প্রথম দিন গভীর অরণ্যে সে দুটি গাছের উঁচু ডালে দোলনা বেঁধে রাত কাটানোর ব্যবস্থা করে। চিতাবাঘের আক্রমণের আশঙ্কায় বন্দুক হাতে তাকে প্রায় সারারাত জেগে থাকতে হয়। অন্ধকার জঙ্গলের মধ্যে বিভিন্ন অজানা প্রাণীর শব্দ তার মনে ভয় তৈরি করে। গভীর রাতে বেবুনের খিলখিল হাসির মতো ডাক শুনেও সে চমকে ওঠে।
এরপর শঙ্কর অনেকটা ‘ফ্লাইং ব্লাইন্ড’-এর মতো নিজের ভাগ্যের উপর নির্ভর করে অরণ্যের মধ্যে এগিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু সঠিক পথ সম্পর্কে নিশ্চিত না থাকায় ক্রমশ সে দিগ্ভ্রান্ত হয়ে পড়ে।
পঞ্চম দিনে সে একটি পাহাড়ের তলায় এসে পৌঁছয়। সেখানে একটি প্রকাণ্ড গুহা দেখতে পেয়ে বিশ্রামের জন্য তার ভিতরে প্রবেশ করে। কিন্তু গুহার ভিতরে ঢোকার পরেই তার বিপদ আরও বেড়ে যায়—সে পথ হারিয়ে ফেলে এবং বেশ কয়েক দিন কয়েক রাত গুহার ভিতরে আটকা পড়ে থাকে।

অধ্যায় ১১: গুহা থেকে মুক্তি ও কালাহারি মরুভূমির পথে
গুহার মধ্যে কয়েক দিন আটকে থাকার ফলে শঙ্করের শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। খিদে ও তেষ্টায় তার অবস্থা প্রায় অবসন্ন হয়ে যায়। কিন্তু বিপদের মধ্যেও সে হাল ছাড়ে না।
একসময় অন্ধকারের মধ্যে সে জলের কুলুকুলু শব্দ শুনতে পায়। শব্দের উৎস অনুসরণ করে এগিয়ে গিয়ে সে ঠান্ডা জলের সন্ধান পায় এবং প্রাণভরে জল পান করে। গুহার ভিতরের নানা স্রোতের পথ মনে রাখার জন্য এবং ফিরে আসার রাস্তা চিনতে সুবিধা হওয়ার জন্য সে উপযুক্ত জায়গায় চিহ্ন রেখে এগোতে থাকে।
এই সময় সে একটি প্রকাণ্ড অজগর সাপের মুখোমুখিও হয়। বিপদ সামলে শেষ পর্যন্ত গুহার বাইরে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয় শঙ্কর।
গুহা থেকে বেরিয়ে আসার পর সে আবার যাত্রা শুরু করে। এবার তার লক্ষ্য কালাহারি মরুভূমির দিকে এগিয়ে যাওয়া। কিন্তু মরুভূমি পার হওয়া সহজ ছিল না। সঠিক দিক নির্ণয়ের সমস্যা, জলের অভাব এবং চারপাশের জনহীন পরিবেশ তার বিপদ বাড়িয়ে দেয়।
দুদিনের মধ্যেই সে পথ হারিয়ে ফেলে। দিনের প্রচণ্ড গরম এবং রাতের তীব্র ঠান্ডার মধ্যে তার সঞ্চিত জলও শেষ হয়ে আসে। চারদিকে শুধু বালি, পাহাড়, ক্যাকটাস এবং গ্রানাইটের ছোটো ছোটো ঢিবি। এই অবস্থায় শঙ্কর এমন একটি জায়গায় পৌঁছয়, যেখান থেকে আর সহজে ফিরে যাওয়ার উপায় নেই।
রাতের শীত থেকে বাঁচার জন্য সে একটি ছোটো পাহাড় বা কোপজে-র গুহায় আশ্রয় নেয়।
কবিতার সারাংশ, ব্যাখ্যা ও প্রশ্নোত্তর পড়ুন
অধ্যায় ১২: গুহার নরকঙ্কাল ও আত্তিলিও গাত্তির চিঠি
এই গুহাতেই চাঁদের পাহাড়-এর কাহিনিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন রহস্যের দরজা খুলে যায়।
গুহার ভিতরে প্রবেশ করে শঙ্কর একটি নরকঙ্কাল দেখতে পায়। কঙ্কালের পায়ে তখনও বুটজুতো রয়েছে। কাছেই ছিল একটি কাঠের পিপে, ছিপি-আঁটা বোতল এবং একটি মরচে-পড়া বন্দুক।
পিপের ভিতরে কী আছে তা দেখার জন্য শঙ্কর সেটি নাড়াতেই একটি বিষধর সাপ বেরিয়ে আসে। শঙ্কর দ্রুত নিজের বন্দুক ব্যবহার করে সাপটিকে মেরে ফেলে। পরে পিপের পুরোনো জলও সে পান করে।
বোতলের ভিতর থেকে পাওয়া একটি চিঠি থেকেই জানা যায় নরকঙ্কালটির পরিচয়। সে হল আত্তিলিও গাত্তি, ফ্লোরেন্সের গাত্তি বংশের এক তরুণ অভিযাত্রী। বহু বছর আগে সে সঙ্গীদের নিয়ে আফ্রিকায় হিরের খোঁজে এসেছিল।
আত্তিলিওর লেখা চিঠি থেকে তার অভিযানের ভয়াবহ পরিণতির কথাও জানা যায়। সঙ্গীদের সঙ্গে বিরোধ, গুহার মধ্যে হিরের খনি আবিষ্কার, আঘাত পাওয়া এবং শেষ পর্যন্ত অনাহার-জলকষ্টে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া—সবকিছুই সেই চিঠিতে ধরা পড়ে।
আত্তিলিও মৃত্যুর আগে অনুরোধ করে যায়, তার নরকঙ্কাল যেন একজন খ্রিস্টানের উপযুক্ত মর্যাদায় সমাধিস্থ করা হয়। শঙ্কর সেই অনুরোধ পূরণ করে। সে কঙ্কালটিকে কবর দেয় এবং কাঠ ও মরচে-পড়া পেরেক দিয়ে একটি ক্রুশ তৈরি করে কবরের উপর স্থাপন করে।
এরপর শঙ্কর চিঠিতে উল্লেখ করা পাঁচটি হিরেও খুঁজে পায়।
এখানেই চাঁদের পাহাড় অধ্যায় ১০-১২-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট হয়—শঙ্কর শুধু নিজের প্রাণ বাঁচানোর জন্য লড়ছে না, অজানা মানুষের অসমাপ্ত ইতিহাসের সঙ্গেও তার যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে।

শব্দার্থ ও টীকা
অধ্যায়গুলির গুরুত্বপূর্ণ শব্দগুলি শুধু মুখস্থ না করে তাদের প্রসঙ্গগত অর্থ বুঝে পড়া ভালো। পরীক্ষায় শব্দার্থের পাশাপাশি ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নেও এগুলি কাজে লাগতে পারে।
| শব্দ | অর্থ |
| জীবন-মরণ | বাঁচা-মরা |
| সাংকেতিক | সংকেত বা সূত্রের সাহায্যে যা বলা হয় |
| গুপ্তচিহ্ন | গোপন সংকেত |
| দুর্বোধ্য | যা সহজে বোঝা যায় না |
| ধূর্ত | চালাক |
| দিগ্ভ্রান্ত | দিশেহারা |
| চন্দ্রাতপ | চাঁদোয়া বা শামিয়ানা |
| সন্তর্পণে | খুব সাবধানে |
| সূচীভেদ্য | অত্যন্ত ঘন |
| দুর্নিরীক্ষ্য | যা ভালোভাবে দেখা বা পর্যবেক্ষণ করা কঠিন |
| সঙ্কীর্ণ / সংকীর্ণ | সরু |
| ঈষৎ | কিছুটা, অল্প |
| লোনা | লবণযুক্ত |
| নিকষকৃষ্ণ | কষ্টিপাথরের মতো কালো |
| উজান | স্রোতের বিপরীত দিক |
| পরিত্রাণ | উদ্ধার বা মুক্তি |
| অঙ্গার | কয়লা |
| বিশ্বাদ | স্বাদহীন |
| সুখাদ্য | ভালো খাবার |
| উত্তাপ | তাপ |
| ক্রমশ | ধীরে ধীরে |
| লুপ্ত | হারিয়ে গেছে |
| সঞ্চিত | জমিয়ে রাখা |
| কোপজে (Kopje) | ছোটো পাহাড় বা গ্রানাইটের ঢিবি |
| মেদিনী | মাটি, পৃথিবী |
| স্বত্ব | অধিকার বা মালিকানা |
| অতর্কিতে | আচমকা |
| জখম | আহত |
| অগ্রসর | এগিয়ে যাওয়া |
| নকশা | খসড়া বা মানচিত্র |
| অভিশপ্ত | অভিশাপগ্রস্ত |
টীকা: এলিফ্যান্ট ঘাস
এলিফ্যান্ট ঘাস আফ্রিকায় দেখা যায় এমন এক ধরনের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘাস। একে ইউগান্ডা ঘাসও বলা হয়। প্রদত্ত পাঠ্য-টীকা অনুযায়ী, এই ঘাস প্রায় ৪–৭ ফুট পর্যন্ত উঁচু হতে পারে এবং দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে।
টীকা: থার্মোমিটার
থার্মোমিটার হল তাপমাত্রা মাপার যন্ত্র। সাধারণভাবে তাপমাত্রা প্রকাশের জন্য সেন্টিগ্রেড বা ফারেনহাইট স্কেল ব্যবহৃত হয়। মানুষের শরীরের তাপমাত্রা মাপার জন্য ব্যবহৃত থার্মোমিটারকে ক্লিনিক্যাল থার্মোমিটার বলা হয়।
গল্পের স্টাডি মেটেরিয়াল
চাঁদের পাহাড় অধ্যায় ১০-১২: ৫টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর
নিচের প্রশ্নগুলিকে শুধু মুখস্থ করার মতো করে নয়, ঘটনা → কারণ → তাৎপর্য এই ধারায় সাজানো হয়েছে। ফলে একই অংশ থেকে অন্য ধরনের প্রশ্ন এলেও উত্তর তৈরি করা সহজ হবে।
১. “এই দুদিন চলেই সে সম্পূর্ণভাবে দিগ্ভ্রান্ত হয়ে পড়েছে।”
(ক) এখানে কার কথা বলা হয়েছে?
(খ) তার দিগ্ভ্রান্ত হওয়ার কারণ কী?
(গ) এই দুদিন সে কীভাবে কাটায়?
(ঘ) পঞ্চম দিনে সে কোথায় উপস্থিত হয়?
উত্তর: (ক) বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চাঁদের পাহাড়’ উপন্যাসের দশম পরিচ্ছেদ থেকে গৃহীত এই অংশে ‘সে’ বলতে উপন্যাসের নায়ক শঙ্করকে বোঝানো হয়েছে।
(খ) আলভারেজের মৃত্যুর পর শঙ্করকে একাই অরণ্য পেরিয়ে সলসবেরির দিকে এগোতে হয়। তার কাছে কয়েকটি মানচিত্র থাকলেও সেগুলিতে অরণ্য, পাহাড় ও পথ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য স্পষ্ট ছিল না। আলভারেজ ও জিম কার্টারের মানচিত্রে কিছু সাংকেতিক চিহ্ন ছিল, যার অর্থও শঙ্করের পক্ষে সহজে বোঝা সম্ভব হয়নি। ফলে নিজের অনুমানের উপর নির্ভর করে চলতে গিয়ে সে সঠিক পথ হারিয়ে ফেলে এবং দিগ্ভ্রান্ত হয়ে পড়ে।
(গ) প্রথম দিন শঙ্কর গভীর অরণ্যের মধ্যে দুটি গাছের উঁচু ডালে দোলনা বেঁধে রাত কাটায়। চিতাবাঘের আক্রমণের আশঙ্কায় বন্দুক হাতে তাকে প্রায় সারারাত জেগে থাকতে হয়। অরণ্যের বিভিন্ন অজানা প্রাণীর শব্দ এবং গভীর রাতে বেবুনের খিলখিল হাসির মতো ডাক তাকে আরও সতর্ক করে তোলে। পরদিন থেকে সে নিজের অনুমানের উপর নির্ভর করে অরণ্যের মধ্যে এগিয়ে যেতে থাকে। এভাবেই তার দুদিন কেটে যায়।
(ঘ) পঞ্চম দিনে শঙ্কর একটি পাহাড়ের তলায় এসে উপস্থিত হয়। সেখানে সে একটি প্রকাণ্ড গুহার মুখ দেখতে পায়। গুহার ভিতর থেকে একটি ক্ষীণ জলস্রোত বেরিয়ে আসছিল। বিশ্রামের জন্য শঙ্কর সেই গুহায় প্রবেশ করে এবং পরে সেখানেই পথ হারিয়ে ফেলে।
মনে রাখার সূত্র:
মানচিত্রে অস্পষ্টতা → নিজের অনুমানে যাত্রা → দিগ্ভ্রান্তি → পঞ্চম দিনে গুহা।
২. “এ বার আর ভয় নেই। এ যাত্রার মতো সে বেঁচে গেল।”
(ক) ‘সে’ বলতে কার কথা বলা হয়েছে?
(খ) এবার আর ভয় নেই কেন?
(গ) এ যাত্রার মতো সে কীভাবে বেঁচে গেল?
(ঘ) বাইরে এসে সে কী দেখল?
(ঙ) এরপর সে কোথায় এসে উপস্থিত হল?
উত্তর: (ক) এখানে ‘সে’ বলতে শঙ্করের কথা বলা হয়েছে।
(খ) বেশ কয়েক দিন গুহার মধ্যে পথ হারিয়ে থাকার পর শঙ্কর অবশেষে গুহার বাইরে যাওয়ার পথ খুঁজে পায়। অন্ধকারের মধ্যে দূরে আকাশের কয়েকটি তারা দেখতে পেয়ে সে বুঝতে পারে যে গুহার মুখ কাছে এবং এবার সে মুক্ত হতে পারবে। তাই তার মনে হয়—এবার আর ভয় নেই।
(গ) গুহার মধ্যে আটকে পড়ে শঙ্কর কয়েক দিন অনাহার ও তেষ্টায় অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছিল। হঠাৎ সে জলের ক্ষীণধারা খুঁজে পায় এবং জল পান করে কিছুটা শক্তি ফিরে পায়। গুহার ভিতরের বিভিন্ন স্রোতের পাশে চিহ্ন রেখে সে পথ খুঁজতে থাকে। পথে একটি প্রকাণ্ড অজগর সাপের বিপদও তাকে সামলাতে হয়। শেষ পর্যন্ত গুহার মুখের দিকে আকাশের তারা দেখতে পেয়ে সে বাইরে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়। এইভাবেই সেই যাত্রায় শঙ্কর প্রাণে বেঁচে যায়।
(ঘ) গুহার বাইরে এসে শঙ্কর দেখতে পায় যে সেখানে গাছপালা তুলনামূলকভাবে কম এবং মাথার উপর স্বচ্ছ রাতের আকাশে অসংখ্য নক্ষত্র দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় অন্ধকার গুহার মধ্যে থাকার পর বাইরের নক্ষত্রখচিত আকাশ তার কাছে অত্যন্ত সুন্দর ও আলোকময় বলে মনে হয়।
(ঙ) পরদিন ভোরের পর শঙ্কর আবার যাত্রা শুরু করে। কিছুদূর যাওয়ার পর সে এলিফ্যান্ট ঘাস দেখতে পায় এবং ধীরে ধীরে অরণ্য শেষ হয়ে একটি বিস্তীর্ণ ফাঁকা অঞ্চলে এসে পড়ে। এই অঞ্চলটি কালাহারি মরুভূমির অংশ।

৩. “শীতের হাত থেকে উদ্ধার পাবার জন্যে শঙ্কর সেই গুহায় আশ্রয় নিলে।”
(ক) শঙ্কর কোন গুহায় আশ্রয় নেয়?
(খ) ‘কোপজে’ কী?
(গ) শঙ্কর কোন অবস্থায় গুহায় আশ্রয় নেয়?
(ঘ) তার ওই অবস্থার কারণ কী?
(ঙ) গুহার বাইরের পরিবেশটি কেমন ছিল?
উত্তর: (ক) কালাহারি মরুভূমির মধ্যে দিয়ে চলতে চলতে শঙ্কর একটি ছোটো পাহাড়ের মধ্যে অবস্থিত গুহায় আশ্রয় নেয়। এই পাহাড়টি গ্রানাইটের তৈরি ছোটো ঢিবির মতো এবং এই ধরনের পাহাড়কে কোপজে বলা হয়।
(খ) ‘কোপজে’ বা Kopje বলতে ছোটো পাহাড় বা গ্রানাইটের তৈরি ছোটো ঢিবিকে বোঝায়। ট্রান্সভাল ও রোডেসিয়া অঞ্চলে এই ধরনের ছোটো পাহাড়কে কোপজে বলা হয়।
(গ) গুহায় আশ্রয় নেওয়ার সময় শঙ্কর অত্যন্ত ক্লান্ত, অবসন্ন ও দুর্বল হয়ে পড়েছিল। মরুভূমির মধ্যে চলতে চলতে তার জল প্রায় শেষ হয়ে যায়। দিনের প্রচণ্ড গরমের পাশাপাশি রাতে তীব্র শীত নেমে আসছিল। আগুন জ্বালানোর কাঠও ফুরিয়ে গিয়েছিল। এমন অবস্থায় রাতের ঠান্ডা থেকে বাঁচার জন্য তাকে গুহায় আশ্রয় নিতে হয়।
(ঘ) শঙ্করের এই অবস্থার মূল কারণ ছিল কালাহারি মরুভূমির মধ্যে সঠিক পথ ধরে এগোতে না পারা। মানচিত্রের সাহায্য নিয়েও সে পথ সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারেনি। ফলে দীর্ঘ সময় মরুভূমির মধ্যে চলতে গিয়ে তার জল ও শক্তি ফুরিয়ে আসে এবং সে ক্রমশ অবসন্ন হয়ে পড়ে।
(ঙ) গুহার চারপাশের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত নির্জন ও জনহীন। চারদিকে শুধু বালি ও বালির ঢিবি দেখা যায়। দূরে কয়েকটি বালির পাহাড়ের মতো উঁচু অংশ এবং কোপজে ছাড়া বিশেষ কিছু চোখে পড়ে না। দিনের পরিবেশ প্রচণ্ড উষ্ণ হলেও সূর্য ডোবার পর সেখানে তীব্র ঠান্ডা নেমে আসে। এই কঠিন পরিবেশই শঙ্করের বিপদকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
৪. “এগিয়ে দু পা গিয়েই চমকে উঠল।”
(ক) উদ্ধৃতাংশে ‘সে’ বলতে কার কথা বলা হয়েছে?
(খ) কোন স্থানের ঘটনার কথা এখানে বলা হয়েছে?
(গ) সে চমকে উঠে কী দেখল?
(ঘ) এরপর সে কোন বিপদের মুখোমুখি হয়েছিল এবং তার মোকাবিলা কীভাবে করেছিল?
(ঙ) সে এখান থেকে কী মূল্যবান বস্তু পেয়েছিল? এরপর সে কী করেছিল?
উত্তর: (ক) বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চাঁদের পাহাড়’ উপন্যাসের দ্বাদশ পরিচ্ছেদের এই অংশে ‘সে’ বলতে শঙ্করকে বোঝানো হয়েছে।
(খ) ঘটনাটি ঘটেছে কালাহারি মরুভূমির মধ্যে একটি ছোটো পাহাড় বা কোপজের গুহায়। রাতের তীব্র শীত থেকে বাঁচার জন্য শঙ্কর এই গুহায় আশ্রয় নিয়েছিল।
(গ) গুহার মধ্যে টর্চ জ্বেলে শঙ্কর দেখতে পায় যে গুহাটি খুব বড়ো নয় এবং মেঝেতে ছোটো ছোটো পাথর ছড়িয়ে রয়েছে। দু-পা এগিয়েই সে গুহার দেয়ালের ধার ঘেঁষে পড়ে থাকা একটি নরকঙ্কাল দেখতে পায়। কঙ্কালের পায়ে তখনও বুটজুতো ছিল। তার পাশে একটি কাঠের পিপে, ছিপি-আঁটা বোতল এবং মরচে-পড়া বন্দুকও ছিল। এই অপ্রত্যাশিত দৃশ্য দেখেই শঙ্কর চমকে ওঠে।
(ঘ) পিপের ভিতরে কী আছে তা জানার জন্য শঙ্কর পিপেটি নাড়াতেই তার নীচ থেকে ফোঁসফোঁস শব্দ শুনতে পায়। মুহূর্তের মধ্যে একটি প্রকাণ্ড বিষধর সাপ উঠে আসে। শঙ্কর ভয় পেলেও দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে তার অটোমেটিক কোল্ট দিয়ে সাপটিকে গুলি করে মেরে ফেলে। এভাবেই সে সেই বিপদ থেকে নিজেকে রক্ষা করে।
(ঙ) গুহায় পাওয়া বোতলের ভিতর থেকে শঙ্কর একটি চিঠি পায়। চিঠিটি ছিল মৃত যুবক আত্তিলিও গাত্তির লেখা। চিঠির নির্দেশ অনুযায়ী শঙ্কর কঙ্কালের বুটজুতোর ভিতর থেকে পাঁচটি বড়ো হিরে পায়। কিন্তু হিরে পাওয়ার আনন্দে সে মৃত মানুষটির প্রতি দায়িত্ব ভুলে যায়নি। আত্তিলিওর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী সে তার নরকঙ্কালটিকে গুহার মধ্যেই কবর দেয়। কাঠ ও মরচে-পড়া পেরেক দিয়ে একটি ক্রুশ তৈরি করে কবরের উপর স্থাপন করে এবং মৃতের আত্মার শান্তির জন্য প্রার্থনা করে।
৫. “হতভাগ্য যুবক। তার মৃত্যুর পরে সুদীর্ঘ তিরিশ বছর কেটে গিয়েছে… এতকাল পরে তার চিঠিখানা মানুষের হাতে পড়ল।”
(ক) ‘হতভাগ্য যুবকটির’ নাম কী ও বয়স কত? তার পরিবারের বিখ্যাত পূর্বপুরুষটি কে?
(খ) তার চিঠিটি কে, কখন ও কোথায় পেয়েছিল?
(গ) কীভাবে তার মৃত্যু হয়?
(ঘ) চিঠির শেষে তার অনুরোধ কী ছিল এবং সেটি কীভাবে রাখা হয়? এই যুবক কোন জিনিস দান হিসেবে রেখে গিয়েছিল? [ICSE 2018]
উত্তর: (ক) হতভাগ্য যুবকটির নাম আত্তিলিও গাত্তি। মৃত্যুর সময় তার বয়স ছিল ২৬ বছর। সে ফ্লোরেন্সের বিখ্যাত গাত্তি পরিবারের সন্তান। তার পরিবারের বিখ্যাত পূর্বপুরুষ ছিলেন রিওলিনো কাভালকান্তি গাত্তি, যিনি লেপান্টোর যুদ্ধে তুর্কিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন।
(খ) আত্তিলিও গাত্তির মৃত্যুর প্রায় তিরিশ বছর পরে তার লেখা চিঠিটি শঙ্কর আবিষ্কার করে। কালাহারি মরুভূমির মধ্যে একটি ছোটো পাহাড় বা কোপজের গুহায় আশ্রয় নেওয়ার পর শঙ্কর সেখানে আত্তিলিওর নরকঙ্কাল দেখতে পায়। নরকঙ্কালের কাছে থাকা বোতলের ভিতর থেকেই সে চিঠিটি খুঁজে পায়।
(গ) আত্তিলিও গাত্তি কয়েকজন সঙ্গীকে নিয়ে আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলের অরণ্য ও রিখটারসভেল্ড পর্বত অঞ্চলে হিরের সন্ধানে গিয়েছিল। অভিযানের সময় গুহার মধ্যে হিরের খনির সন্ধান পাওয়া গেলেও পরে সঙ্গীরা তাকে অবিশ্বাস করে এবং তার উপর আক্রমণ করে। সংঘর্ষে আত্তিলিও গুরুতরভাবে আহত হয়। এরপর আহত অবস্থায় অনাহার, জলকষ্ট এবং ক্ষতস্থানের যন্ত্রণায় দুর্বল হয়ে পড়তে পড়তে শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যু হয়।
(ঘ) মৃত্যুর আগে আত্তিলিও অনুরোধ করে যায়, তার মৃত্যুর পর কেউ যেন তাকে একজন খ্রিস্টানের উপযুক্ত মর্যাদায় সমাধিস্থ করে। শঙ্কর সেই অনুরোধকে সম্মান করে তার নরকঙ্কালটিকে কবর দেয়। পরে কাঠের পিপের ভাঙা কাঠ এবং মরচে-পড়া পেরেক দিয়ে একটি ক্রুশ তৈরি করে কবরের উপর স্থাপন করে এবং মৃতের আত্মার শান্তির জন্য প্রার্থনা করে।
আত্তিলিও তার হিরের খনির স্বত্ব এবং বুটজুতোর মধ্যে রাখা পাঁচটি হিরে দান হিসেবে রেখে গিয়েছিল।
স্কলারশিপের তথ্য জানুন
এক নজরে: অধ্যায় ১০ থেকে ১২-এর ঘটনাপথ
এই তিনটি অধ্যায় আলাদা আলাদা ঘটনা হিসেবে পড়লে অনেক তথ্য মনে রাখা কঠিন হতে পারে। বরং শঙ্করের যাত্রাটিকে একটি ধারাবাহিক পথ হিসেবে মনে রাখলে পুরো অংশটি সহজ হয়ে যায়।
আলভারেজের মৃত্যু
↓
মানচিত্র দেখে পথ খোঁজার চেষ্টা
↓
অরণ্যে নিজের অনুমানে যাত্রা
↓
দিগ্ভ্রান্ত হয়ে পড়া
↓
গুহায় প্রবেশ ও পথ হারানো
↓
জল খুঁজে পাওয়া ও অজগরের বিপদ
↓
গুহা থেকে মুক্তি
↓
কালাহারি মরুভূমিতে প্রবেশ
↓
পথ হারানো + জল শেষ + তীব্র গরম ও ঠান্ডা
↓
কোপজের গুহায় আশ্রয়
↓
নরকঙ্কাল আবিষ্কার
↓
বিষধর সাপের সঙ্গে সংঘর্ষ
↓
আত্তিলিও গাত্তির চিঠি আবিষ্কার
↓
পাঁচটি হিরে পাওয়া
↓
আত্তিলিওকে সমাধিস্থ করা
এই ঘটনাক্রমটি মনে রাখতে পারলে চাঁদের পাহাড় অধ্যায় ১০-১২-এর সারাংশ এবং বেশিরভাগ ঘটনাভিত্তিক প্রশ্নের উত্তর নিজের ভাষায় তৈরি করা অনেক সহজ হবে।
পরীক্ষার আগে যে কয়েকটি বিষয় অবশ্যই বুঝে রাখবে
এই অংশ থেকে শুধু নাম ও ঘটনা মুখস্থ করলেই হবে না। কয়েকটি কারণ-ফল সম্পর্ক পরিষ্কার থাকা দরকার।
- শঙ্কর কেন দিগ্ভ্রান্ত হয়েছিল?
- গুহার ভিতরে সে কীভাবে পথ খুঁজে পেয়েছিল?
- কালাহারি মরুভূমিতে তার বিপদ কেন বাড়তে থাকে?
- কোপজে বলতে কী বোঝায়?
- গুহায় নরকঙ্কালটি কার ছিল?
- আত্তিলিও গাত্তি কীভাবে মারা যায়?
- আত্তিলিওর চিঠির গুরুত্ব কোথায়?
- শঙ্কর কেন আত্তিলিওকে সমাধিস্থ করেছিল?
- পাঁচটি হিরে পাওয়ার পরও শঙ্করের আচরণ কীভাবে তার চরিত্রের পরিচয় দেয়?
বিশেষ করে শঙ্করের বিপদের সঙ্গে তার সিদ্ধান্তগুলির সম্পর্ক বুঝে পড়লে এই অধ্যায়গুলির ৫ নম্বর বা বড়ো প্রশ্নের উত্তর লেখার সময় শুধু কাহিনি বলার বদলে বিশ্লেষণ যোগ করা যাবে।
চাঁদের পাহাড় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: ছোট্ট Revision Map
দশম পরিচ্ছেদ → অরণ্য + দিগ্ভ্রান্তি + গুহা
একাদশ পরিচ্ছেদ → গুহা থেকে মুক্তি + কালাহারি + কোপজে
দ্বাদশ পরিচ্ছেদ → নরকঙ্কাল + সাপ + আত্তিলিওর চিঠি + হিরে + সমাধি
শেষ কথা
চাঁদের পাহাড় অধ্যায় ১০-১২-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল শঙ্করের একাকী অভিযানের ক্রমশ কঠিন হয়ে ওঠা। দশম পরিচ্ছেদে সে পথ হারায়, একাদশ পরিচ্ছেদে প্রকৃতি ও মরুভূমির সঙ্গে লড়াই করে এবং দ্বাদশ পরিচ্ছেদে তার সামনে খুলে যায় বহু বছরের পুরোনো আত্তিলিও গাত্তির কাহিনি।
তাই পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় এই অংশকে শুধু “গুহায় কী হয়েছিল” বা “আত্তিলিও কে ছিল” হিসেবে না দেখে শঙ্করের পুরো যাত্রার একটি ধারাবাহিকতা হিসেবে পড়ো। এতে সারাংশ, টীকা এবং প্রশ্নোত্তর—তিনটিই একসঙ্গে মনে রাখা সহজ হবে।
👉 চাঁদের পাহাড়ের আগের অধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর
👉 চাঁদের পাহাড় অধ্যায় ৪-৬: সারাংশ ও প্রশ্নোত্তর
👉 চাঁদের পাহাড় অধ্যায় ১-৩: সারাংশ ও প্রশ্নোত্তর
আমাদের সব নোটসের দ্রুত আপডেট, গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর, নোটসের পিডিএফ পেতে যুক্ত হোন আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ও টেলিগ্রাম চ্যানেলে। সঙ্গে থাকবে ফাইনাল পরীক্ষার আগে অনলাইন মকটেস্টের সুবিধাও।

One Comment