ক্যানভাসার গল্পের কাহিনিসংক্ষেপ ও মূলভাব | ICSE Class 9 Bengali
বনফুলের ‘ক্যানভাসার’ গল্পটি আপাতদৃষ্টিতে একটি সাধারণ ঘটনার গল্প হলেও এর মধ্যে মানুষের স্বভাব, অভাব, আত্মসম্মান, রাগ এবং শেষ পর্যন্ত মানবিকতার একটি সুন্দর দিক ফুটে উঠেছে। গল্পের শুরুতে ভৈরবের সঙ্গে ক্যানভাসার হীরালালের অকারণ বচসা তৈরি হলেও গল্পের শেষে সেই সম্পর্কই একেবারে অন্য রূপ নেয়।
ক্যানভাসার গল্পের কাহিনিসংক্ষেপ
গল্পের শুরুতে দেখা যায়, কাত্যায়নী একটি শৌখিন শাড়ি কিনতে চায়। কিন্তু তার স্বামী ভৈরব বেকার হওয়ায় স্ত্রীর সেই শখ পূরণ করার মতো সামর্থ্য তার নেই। তার উপর ভৈরব অকারণে বাবুয়ানির কথা বলায় কাত্যায়নী আরও রেগে যায়। সে ভৈরবকে এমন কথাও শোনায় যে, যার এক কড়াও খরচ করার ক্ষমতা নেই, তার আবার এত বাবুয়ানির কী প্রয়োজন?
স্ত্রীর কথায় অপমানিত ও রাগান্বিত হয়ে ভৈরব বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। কিছুটা শান্ত হওয়ার জন্য সে নিমগাছের ডাল ভেঙে দাঁত মাজতে উদ্যত হয়। ঠিক সেই সময় পিছন থেকে একটি ডাক শুনতে পায়—
“মাজন চাই—ভালো দাঁতের মাজন।”
ভৈরব পিছন ফিরে দেখে, একটি সুটকেশ হাতে সম্পূর্ণ অপরিচিত এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আছে। লোকটির নাম হীরালাল। সে একজন ক্যানভাসার। বিভিন্ন ধরনের দ্রব্য বাড়ি বাড়ি কিংবা হাটেবাজারে ফেরি করে বিক্রি করাই তার কাজ।
আসলে হীরালালের এই পল্লিতে আসার কথা ছিল না। সে শহরে যাওয়ার জন্য ট্রেনে উঠেছিল। কিন্তু ট্রেনে ঘুমিয়ে পড়ায় নির্দিষ্ট জায়গা পেরিয়ে এই পল্লিতে এসে নামে। সন্ধ্যার আগে ফেরার ট্রেন না থাকায় সে ভাবল, এই সময়টুকু কাজে লাগিয়ে যদি কিছু জিনিস বিক্রি করা যায়, তাহলে মন্দ হয় না।
হীরালাল ভৈরবকে তার মাজনের কথা বলতে শুরু করে এবং তার গুণাগুণ বোঝানোর চেষ্টা করে। কিন্তু সেই মুহূর্তে ভৈরবের মন এমনিতেই খারাপ ছিল। স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার পর সে আরও বিরক্ত হয়ে ওঠে।
হীরালালের কথাবার্তা যত বাড়তে থাকে, ভৈরবের বিরক্তিও তত বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত সে হীরালালকে বলে—
“সরে পড়ুন মশাই। আপনারা হচ্ছেন দেশের শত্রু।”
ভৈরবের মতে, ক্যানভাসাররা নানা ধরনের শৌখিন ও অপ্রয়োজনীয় জিনিস মানুষের সামনে এনে তাদের কেনার লোভ বাড়িয়ে দেয়। এভাবে তারা দেশের মানুষের ক্ষতি করছে।
কিন্তু হীরালাল ভৈরবের কথায় বিশেষ বিচলিত হয় না। বরং হেসে বলে যে দেশে দাঁতের রোগের অভাব নেই। তার এই কথায় ভৈরব আরও রেগে যায় এবং তাকে গ্রাম থেকে বেরিয়ে যেতে বলে।
এবার হীরালালও প্রশ্ন করে বসে—
“আপনিই কি এই গ্রামের মালিক?”
এই প্রশ্নটি ভৈরবের আত্মসম্মানে আঘাত করে। সে নিজে চাকরি করে না, তার আর্থিক অবস্থাও ভালো নয়; কিন্তু শরীরে তার যথেষ্ট শক্তি রয়েছে। তাই গ্রামের মালিক না হয়েও সে মনে করে, চাইলে এই লোকটিকে গ্রামছাড়া করার ক্ষমতা তার আছে।
দুজনের মধ্যে বচসা ক্রমশ তীব্র হতে থাকে। কেউ কাউকে ছাড়তে রাজি নয়। শেষ পর্যন্ত কথার লড়াই হাতাহাতিতে পৌঁছে যায়। ভৈরব হীরালালকে একটি প্রচণ্ড চড় মারে।
আর তখনই ঘটে গল্পের গুরুত্বপূর্ণ মোড়।
ভৈরব অবাক হয়ে দেখে, হীরালালের মুখ থেকে দাঁতের পাটি খুলে পড়ে গেছে। আসলে হীরালাল সম্পূর্ণ ফোকলা। তার যে দাঁতগুলি দেখা যাচ্ছিল, সেগুলি ছিল বাঁধানো দাঁত।
ভৈরব হীরালালের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু হীরালাল এই ঘটনাতেও রাগ না করে হাসতে হাসতে নিজের অবস্থার কথা বলতে শুরু করে। সে জানায়, তার কাছে ভালো কলপও আছে। এমনকি ভৈরবকে সেটি নেওয়ার কথাও বলে।
এরপর হীরালাল নিজের জীবনের দুঃখের কথা জানায়। সে একজন গরিব মানুষ। এইভাবেই কষ্ট করে সংসার চালায়। তার উপযুক্ত ছেলেটিও অকালেই মারা গেছে। তার কথায় বোঝা যায়, জীবনের শেষ বয়সে এসে সে অত্যন্ত অসহায় অবস্থার মধ্যে দিয়ে দিন কাটাচ্ছে।
এই কথাগুলি শুনে ভৈরবের আগের রাগ আর থাকে না। কিছুক্ষণ আগেও যে মানুষটিকে সে “দেশের শত্রু” বলেছিল, তার জীবনসংগ্রামের কথা শুনে সেই মানুষটির প্রতিই তার মনে সহানুভূতি তৈরি হয়।
শেষে হতভম্ব ভৈরবের মুখ থেকে বেরিয়ে আসে—
“আচ্ছা, দিন এক কৌটো মাজন।”
এই ছোট্ট বাক্যটির মধ্যেই গল্পের আসল পরিবর্তনটি ধরা পড়ে।

ভৈরবের মানসিক পরিবর্তন
‘ক্যানভাসার’ গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলির একটি হল ভৈরবের মানসিক পরিবর্তন।
গল্পের শুরুতে ভৈরব নিজের অভাব এবং স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়ার কারণে মানসিকভাবে উত্তেজিত ছিল। ফলে হীরালালের মতো একজন সাধারণ ফেরিওয়ালার উপস্থিতিও তার কাছে বিরক্তিকর মনে হয়।
হীরালাল যখন মাজন বিক্রি করতে চায়, তখন ভৈরব শুধু তার পণ্যকেই অপছন্দ করে না, বরং ক্যানভাসারদেরই দেশের শত্রু বলে মনে করে। নিজের রাগের বশে সে হীরালালের সঙ্গে ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত তাকে চড়ও মারে।
কিন্তু হীরালালের ব্যক্তিগত জীবনের দুঃখের কথা শোনার পর ভৈরবের মন বদলে যায়। সে বুঝতে পারে, তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি কোনো ‘দেশের শত্রু’ নয়; সে আসলে একজন দরিদ্র মানুষ, যে নিজের জীবিকা চালানোর জন্য পরিশ্রম করে চলেছে।
তাই গল্পের শেষে রাগের জায়গা নেয় সহানুভূতি। আর সেই পরিবর্তনের প্রকাশ ঘটে এক কৌটো মাজন কেনার সিদ্ধান্তে।
হীরালাল চরিত্রের বিশেষ দিক
হীরালালকে শুধু একজন ক্যানভাসার হিসেবে দেখলে গল্পটির আসল দিকটি ধরা যাবে না। সে একজন দরিদ্র মানুষ, কিন্তু তার মধ্যে হাস্যরস, ধৈর্য এবং জীবনের প্রতি এক ধরনের সহজ স্বাভাবিক মনোভাব রয়েছে।
ভৈরব তাকে অপমান করে, এমনকি মারধরও করে। তবু নিজের দুঃখের কথা বলার সময় হীরালালের মধ্যে কোনো বড়াই দেখা যায় না। বরং সে নিজের অবস্থাকে সহজভাবে মেনে নিয়েই সংসার চালানোর কথা বলে।
তার এই চরিত্রই শেষ পর্যন্ত ভৈরবের মনে পরিবর্তন আনে।
ICSE Class 9 Bengali আরও স্টাডি মেটেরিয়াল
ক্যানভাসার গল্পের মূল বক্তব্য
গল্পটির মধ্যে দিয়ে বনফুল মানুষের একটি পরিচিত মানসিক দিক তুলে ধরেছেন। অনেক সময় নিজের জীবনের হতাশা, অভাব কিংবা অপমানের রাগ আমরা অন্য একজন মানুষের উপর গিয়ে প্রকাশ করি। ভৈরবের ক্ষেত্রেও তেমনটাই ঘটেছিল।
স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়ার পর তার মন আগে থেকেই উত্তেজিত ছিল। সেই অবস্থায় হীরালাল তার সামনে এসে পড়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।
কিন্তু একজন মানুষের বাইরের পরিচয় দেখে তাকে বিচার করা সবসময় ঠিক নয়। তার জীবনের পিছনে হয়তো এমন অনেক দুঃখ-কষ্ট লুকিয়ে থাকে, যা আমরা জানি না।
‘ক্যানভাসার’ গল্পের শেষ মুহূর্ত তাই শুধু মাজন কেনার ঘটনা নয়; এটি ভৈরবের মানবিক চেতনার জেগে ওঠার মুহূর্ত।

পরীক্ষার জন্য মনে রাখার মতো বিষয়
- লেখক: বনফুল (বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়)
- গল্প: ‘ক্যানভাসার’
- প্রধান চরিত্র: ভৈরব, কাত্যায়নী ও হীরালাল
- কাত্যায়নী: ভৈরবের স্ত্রী
- হীরালাল: ক্যানভাসার; বিভিন্ন দ্রব্য ফেরি করে বিক্রি করে
- ভৈরবের সঙ্গে হীরালালের ঝগড়ার কারণ: মাজন বিক্রি করা নিয়ে কথাবার্তা থেকে বচসা
- ভৈরব হীরালালকে কী বলে: “দেশের শত্রু”
- গল্পের গুরুত্বপূর্ণ মোড়: ভৈরবের চড়ে হীরালালের বাঁধানো দাঁত খুলে পড়ে যায়
- হীরালালের দুঃখ: সে দরিদ্র এবং তার উপযুক্ত ছেলেটি অকালেই মারা গেছে
- শেষে ভৈরব কী করে: হীরালালের কাছ থেকে এক কৌটো মাজন কিনতে চায়
- গল্পের প্রধান দিক: রাগ ও বিরক্তি থেকে সহানুভূতি ও মানবিকতায় পরিবর্তন
এক নজরে গল্পের ঘটনাপ্রবাহ
কাত্যায়নীর শখ → ভৈরবের অপমান ও রাগ → বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসা → হীরালালের সঙ্গে দেখা → মাজন বিক্রির চেষ্টা → বচসা → হাতাহাতি → হীরালালের বাঁধানো দাঁত খুলে যাওয়া → হীরালালের দুঃখের কথা জানা → ভৈরবের মন পরিবর্তন → এক কৌটো মাজন কেনা।
📥 ক্যানভাসার গল্পের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর PDF
৫ নম্বরের উপযোগী গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও বিস্তারিত উত্তর একসঙ্গে পড়তে PDF-টি ডাউনলোড/দেখে নাও।
[ক্যানভাসার গল্পের প্রশ্নোত্তর PDF দেখুন]
📚 আরও পড়ো: ICSE Class 9 Bengali গল্পের প্রস্তুতি
‘ক্যানভাসার’ গল্পের কাহিনি ও চরিত্রগুলি ভালোভাবে বুঝে গেলে এবার ICSE Class 9 Bengali-এর আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গল্প ঝালিয়ে নিতে পারো।
👉 গিন্নি গল্পের সহজ ভাষায় কাহিনিসংক্ষেপ ও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা — গল্পের মূল ঘটনা, চরিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি একসঙ্গে দেখে নাও।
👉 ক্যানভাসার গল্পের গুরুত্বপূর্ণ ৫টি প্রশ্নোত্তর — এই প্রশ্নগুলি পড়ে গেলে পরীক্ষায় অন্য সমস্ত প্রশ্নের উত্তর সহজে করা যাবে।
👉 লালু গল্পের কাহিনিসংক্ষেপ ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর — পরীক্ষার আগে গল্পটির গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলি দ্রুত রিভিশন করতে সাহায্য করবে।

3 Comments